ঘুরে দাঁড়াচ্ছে অর্থনীতি

টানা রাজনৈতিক অস্থিরতার পর ঘুরে দাঁড়াচ্ছে দেশের অর্থনীতি। ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসায় ব্যবসায়ীরাও আশাবাদী হয়ে উঠছেন। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে অর্থনীতির চাকাও সচল থাকবে বলে মনে করছেন অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা।
সূত্রমতে, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে গত বছর রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছিল। টানা হরতাল-অবরোধে অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তবে বর্তমানে বিরোধী জোটের আন্দোলন কর্মসূচি না থাকায় ব্যবসায়ীদের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অব্যাহত থাকলে ব্যবসায়ীরা গত বছরের ক্ষতি ধীরে ধীরে পুষিয়ে নিতে পারবেন।
সূত্র জানায়, উৎপাদন থেকে শুরু করে আমদানি-রপ্তানিসহ অর্থনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে কর্মচাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে পুরোমাত্রায় কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। তৈরি পোশাকশিল্পসহ সব ধরনের শিল্পে উৎপাদন শুরু হয়েছে। কৃষিপণ্য পরিবহনে আর বাধা নেই। কক্সবাজারসহ বিভিন্ন পর্যটননগরীতে পর্যটক বাড়ছে। দেশের সর্বত্র ব্যবসা-বাণিজ্য আবার স্বাভাবিক হয়েছে। নির্বাচনের পর পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসায় প্রায় প্রতিদিনই সূচকের পাশাপাশি লেনদেনের পরিমাণ বাড়ছে।
এদিকে, দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলসহ ছয়টি বড় প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ফাস্টট্র্যাক মনিটরিং কমিটির বৈঠকে এ নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। তবে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার বিষয়টি এখনো নতুন উদ্যোক্তাদের চিন্তার কারণ। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এখনো পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারেননি। বিনিয়োগে উৎসাহিত করে এই বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকারকে বেশকিছু পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলেন, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে এলেই দেশে শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
নতুন বিনিয়োগ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিনিয়োগে আগ্রহীরা এখনো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। বিনিয়োগ বাড়াতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা, গ্যাস-বিদ্যুতসহ অবকাঠামো উন্নয়ন ও ব্যাংক ঋণের সুদহার কমানো জরুরি। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মূলত দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দরকার। অল্প কয়েকদিনের স্থিতিশীলতা বিনিয়োগের নিশ্চয়তা দেয় না, আর আশা করাও ঠিক নয়।
এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যায়যায়দিনকে বলেন, বর্তমান স্থিতিশীল পরিস্থিতি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। নানা ঘটনার পর দেশে এখন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে হরতাল-অবরোধের মতো ধ্বংসাত্মক কোনো কর্মসূচি আপাতত নেই। তবে বিরোধীদলীয় নেত্রী সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বলেছেন, অনন্তকাল সংলাপের জন্য অপেক্ষা করবেন না। আবার সরকারের কিছু মন্ত্রী বলছেন তারা পাঁচ বছরই ক্ষমতায় থাকবেন। সেদিক থেকে রাজনৈকিক অস্থিরতা না থাকলেও অনিশ্চয়তা কাটেনি। ফলে বিনিয়োগকারীরা কিছুটা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। যে কারণে এখনো পুরোপুরি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি।
মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নির্ভর করছে রাজনীতিবিদদের ওপর। এ স্থিতিশীল পরিস্থিতি বজায় থাকলে প্রবৃদ্ধি সাড়ে পাঁচ শতাংশের মধ্যে থাকবে। আর এ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলকে সমঝোতায় আসতে হবে। তাহলে দেশের অর্থনীতির চলমান ধারা অব্যাহত থাকবে বলে মনে করেন তিনি।
একই প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ যায়যায়দিনকে বলেন, রাজনৈতিক সহিংসতা না থাকলে আগামী মার্চের মধ্যে উদ্যোক্তারা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবে। এ জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। বিরোধী দল আন্দোলন করলেও যেন সহিংসতা না হয়, তাহলেই অর্থনীতির গতিধারা ঠিক থাকবে। আর এক্ষেত্রে সরকারকেই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি আরো বলেন, নির্বাচনের পর সব সেক্টরের মতো অর্থনীতিতেও স্বস্তির আভাস দেখা যাচ্ছ। তবে দেশের রাজনীতি যতদিন স্থিতিশীল থাকবে অর্থনীতির এ অবস্থাও ততদিনই স্থিতিশীল থাকবে। বর্তমান স্থিতিশীল পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক কর্মকা-কে গতিশীল করতে হলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। পাশাপাশি সরকারকে ব্যবসা সহায়কনীতি গ্রহণ করতে হবে বলেও অভিমত দেন তিনি।
এদিকে, পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম মান্নান কচি যায়যায়দিনকে বলেন, 'নির্বাচন পূর্ববর্তী টানা রাজনৈতিক অস্থিরতায় পোশাকশিল্পে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে রানা প্লাজা ধসের পর সারাবিশ্বে পোশাকশিল্প ইমেজ সঙ্কটে পড়ে। এরপর টানা হরতাল-অবরোধ বিদেশি ক্রেতাদের অনাগ্রহ সৃষ্টি করে। তবে বর্তমানে খুব সুন্দর রাজনৈতিক পরিবেশ বিরাজ করছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে যেসব বিদেশি ক্রেতা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, তারা আবার ফিরে আসবে। আমরা চেষ্টা করছি, পোশাকশিল্পের ইমেজ সঙ্কট কীভাবে দূর করা যায়। তবে সবকিছু নির্ভর করছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর।'
সূত্র: যায় যায় দিন, ০৯ ফেব্রুয়ারী ২০১৪

,

0 comments

আপনার মন্তব্য লিখুন